F

আজ কলকাতার আবহাওয়া ১২ আগস্ট ২০২৬: ঝমঝম বৃষ্টি, অন্ধকার আকাশ, নিম্নচাপের প্রভাব

১২ আগস্ট ২০২৬ কলকাতায় ঘন কালো মেঘ ও ঝমঝম বৃষ্টি
উত্তর বঙ্গোপসাগরের নিম্নচাপের প্রভাবে কলকাতা সহ দক্ষিণবঙ্গে বৃষ্টির পরিবেশ


আজ বুধবার, ১২ আগস্ট ২০২৬। সন্ধ্যা ছটা নাগাদ কলকাতার আকাশের দিকে তাকালেই বোঝা যাচ্ছে, আবহাওয়ার পরিস্থিতি একেবারেই বদলে গেছে। সকাল বা দুপুরের তুলনায় সন্ধ্যার আকাশ অনেক বেশি অন্ধকার হয়ে এসেছে। চারদিকে ঘন কালো মেঘ, তার সঙ্গে ঝমঝম করে বৃষ্টি। অনেক জায়গায় রাস্তায় জল জমে  গিয়েছে এবং বৃষ্টির তীব্রতাও সময়ে সময়ে বেড়ে যাচ্ছে।

কলকাতা সহ দক্ষিণবঙ্গের একাধিক এলাকায় আজ বৃষ্টির এই পরিস্থিতির পিছনে রয়েছে উত্তর বঙ্গোপসাগরে তৈরি হওয়া নিম্নচাপ। ভারতের আবহাওয়া দফতর বা IMD-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, উত্তর বঙ্গোপসাগরে পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের উপকূলের কাছাকাছি একটি নিম্নচাপ অবস্থান করছে। এই নিম্নচাপের সঙ্গে যুক্ত ঘূর্ণাবর্তটি উপরের দিকে প্রায় ৭.৬ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত। ([Mausam][1])

ফলে বঙ্গোপসাগর থেকে প্রচুর জলীয়বাষ্পযুক্ত বাতাস পশ্চিমবঙ্গের দিকে আসছে। সেই আর্দ্র বাতাস উপরে উঠে ঠান্ডা হওয়ার কারণে মেঘের পরিমাণ বাড়ছে এবং তৈরি হচ্ছে বৃষ্টির পরিবেশ।

আজ সন্ধ্যায় কলকাতার আকাশ এত অন্ধকার কেন

সন্ধ্যা নামার আগেই কলকাতার আকাশ অস্বাভাবিকভাবে অন্ধকার হয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ হল ঘন মেঘের উপস্থিতি। যখন একটি বড় আবহাওয়া ব্যবস্থা বা নিম্নচাপের প্রভাবে প্রচুর আর্দ্র বাতাস উপরে উঠে যায়, তখন সেই বাতাস ঠান্ডা হয়ে জলীয়বাষ্পকে ক্ষুদ্র জলকণায় পরিণত করে।

এই জলকণা এবং বরফকণা একসঙ্গে জমে বড় বড় মেঘ তৈরি করে। মেঘ যত ঘন হয়, তার মধ্যে দিয়ে সূর্যের আলো তত কম মাটিতে পৌঁছাতে পারে। সেই কারণেই দিনের আলো থাকলেও অনেক সময় চারপাশ সন্ধ্যার মতো অন্ধকার দেখায়।

আজ কলকাতায় সন্ধ্যার সময় যে অন্ধকার মেঘ দেখা যাচ্ছে এবং তার সঙ্গে ঝমঝম করে বৃষ্টি হচ্ছে, সেটি এই ধরনের সক্রিয় বৃষ্টিবাহী মেঘের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

IMD-এর স্যাটেলাইট তথ্যেও মেঘের অবস্থান ও বিস্তার পর্যবেক্ষণ করা হয়। আবহাওয়ার স্যাটেলাইট ছবিতে মেঘের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য দেখে আবহাওয়াবিদরা বৃষ্টির সম্ভাবনা এবং মেঘের গতিবিধি সম্পর্কে ধারণা পান। ([Mausam][2])

আজ কলকাতায় কতটা বৃষ্টি হতে পারে

আজকের সরকারি পূর্বাভাস অনুযায়ী কলকাতা সহ দক্ষিণবঙ্গের বেশ কিছু এলাকায় বৃষ্টি এবং বজ্রসহ বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে একটি বিষয় পরিষ্কার করে বলা দরকার। IMD কলকাতার জন্য এমন কোনো নির্দিষ্ট পূর্বাভাস দেয়নি যে আজ ঠিক কত মিলিমিটার বৃষ্টি হবে বা সন্ধ্যা থেকে ঠিক কত ঘণ্টা একটানা বৃষ্টি চলবে। তাই সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচলিত কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা দেখে কলকাতায় সেই পরিমাণ বৃষ্টি নিশ্চিত ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।

সরকারি পূর্বাভাসে দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন জেলার ক্ষেত্রে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা দেখানো হয়েছে। বিশেষ করে দক্ষিণ ২৪ পরগনা ও পূর্ব মেদিনীপুরের কিছু জায়গায় ৭ থেকে ২০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। এক-দুই জায়গায় ২০ সেন্টিমিটারের বেশি অত্যন্ত ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনাও রয়েছে।

কলকাতা, উত্তর ২৪ পরগনা, হাওড়া, হুগলি এবং পশ্চিম মেদিনীপুরের এক-দুই জায়গাতেও ৭ থেকে ২০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনার কথা জানানো হয়েছে। ([Mausam][3])

এর অর্থ এই নয় যে কলকাতার প্রতিটি এলাকায় ২০ সেন্টিমিটার বৃষ্টি হবে। এই পরিমাণটি সম্ভাব্য বৃষ্টির সতর্কতা এবং নির্দিষ্ট কিছু জায়গার জন্য প্রযোজ্য। তাই কলকাতার ক্ষেত্রে স্থানভেদে বৃষ্টির পরিমাণ অনেকটাই আলাদা হতে পারে।

 বৃষ্টি কি সারারাত একটানা চলবে

এখন অনেকেরই প্রশ্ন, সন্ধ্যায় যেভাবে ঝমঝম করে বৃষ্টি শুরু হয়েছে, সেটা কি সারা রাত চলবে?

এর নির্দিষ্ট উত্তর এখনই দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ বৃষ্টির মেঘের গতিবিধি খুব দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে। কোথাও একটানা কিছু সময় বৃষ্টি হতে পারে, আবার কোথাও বৃষ্টির পর বিরতি আসতে পারে। এরপর আবার নতুন করে বৃষ্টির মেঘ তৈরি হয়ে বৃষ্টি নামতে পারে।

অর্থাৎ আজকের পরিস্থিতিকে একটানা নির্দিষ্ট কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টি না বলে দফায় দফায় বৃষ্টি এবং কিছু সময়ে ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিযুক্ত।

 কেন তৈরি হচ্ছে এত মেঘ

এখন আসা যাক আজকের আবহাওয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিতে।

বঙ্গোপসাগরের উপর থাকা নিম্নচাপের কারণে সমুদ্রের দিক থেকে প্রচুর আর্দ্র বাতাস স্থলভাগের দিকে আসছে। এই বাতাসে জলীয়বাষ্পের পরিমাণ বেশি থাকে।

উষ্ণ ও আর্দ্র বাতাস যখন উপরের দিকে উঠতে থাকে, তখন উচ্চতার সঙ্গে সঙ্গে তাপমাত্রা কমতে থাকে। ফলে বাতাসের মধ্যে থাকা জলীয়বাষ্প ঘনীভূত হয়ে ক্ষুদ্র জলকণায় পরিণত হয়।

এই জলকণাগুলো ধুলো বা অন্যান্য ক্ষুদ্র কণাকে কেন্দ্র করে একত্রিত হতে থাকে। ধীরে ধীরে তৈরি হয় মেঘ।

যদি বাতাসের ঊর্ধ্বমুখী গতি শক্তিশালী হয় এবং প্রচুর জলীয়বাষ্প সরবরাহ হতে থাকে, তাহলে মেঘ অনেক বড় এবং ঘন হতে পারে। এই ধরনের মেঘ থেকেই ভারী বৃষ্টি এবং অনেক সময় বজ্রপাত হতে পারে।

মেঘ থেকে কীভাবে বৃষ্টি নামে

সহজ ভাষায় বললে, বৃষ্টি আসলে মেঘের ভিতরে তৈরি হওয়া জলকণারই পরিণতি।

প্রথমে সমুদ্র, নদী, পুকুর এবং মাটির জল সূর্যের তাপে বাষ্পীভূত হয়ে বাতাসে জলীয়বাষ্প হিসেবে মিশে যায়।

এরপর সেই জলীয়বাষ্পযুক্ত বাতাস উপরে উঠে যায়।

উপরে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে বাতাস ঠান্ডা হয়।

ঠান্ডা হওয়ার পর জলীয়বাষ্প ক্ষুদ্র জলকণায় পরিণত হয়।

এই জলকণাগুলো একে অপরের সঙ্গে মিলিত হয়ে ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে।

একসময় জলকণার ওজন এত বেড়ে যায় যে সেগুলো আর বাতাসে ভেসে থাকতে পারে না।

তখন মাধ্যাকর্ষণের টানে জলকণা নিচে নেমে আসে।

এইভাবেই আমরা বৃষ্টি দেখতে পাই।

 বজ্রপাত কেন হতে পারে

বৃষ্টির মেঘের মধ্যে শুধু জলকণা থাকে না। সেখানে বরফকণা, ছোট ছোট জলকণা এবং শক্তিশালী ঊর্ধ্বমুখী ও নিম্নমুখী বায়ুপ্রবাহও থাকতে পারে।

এই কণাগুলোর মধ্যে সংঘর্ষের ফলে মেঘের ভিতরে বৈদ্যুতিক চার্জ আলাদা হয়ে যেতে পারে। চার্জের পার্থক্য বেশি হলে হঠাৎ বৈদ্যুতিক নিঃসরণ ঘটে এবং আমরা বজ্রপাত দেখতে পাই।

বজ্রপাতের পর যে শব্দ শোনা যায় সেটিই বজ্রধ্বনি।

তাই আজকের মতো সক্রিয় বৃষ্টির পরিবেশে আকাশে কালো মেঘের সঙ্গে বজ্রপাতও হতে পারে। বাইরে থাকলে বজ্রপাতের সময় খোলা মাঠ, গাছের নিচে বা জলাশয়ের কাছে না থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়।

 আগামী কয়েকদিনেও বৃষ্টি থাকবে

আজকের বৃষ্টির পরেই যে আবহাওয়া পুরোপুরি শুকিয়ে যাবে, এমনটা নয়।

IMD-এর ১২ আগস্টের সতর্কতা অনুযায়ী আগামী কয়েকদিনও দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় বৃষ্টি এবং বজ্রসহ বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। Gangetic West Bengal-এর জন্য ১৩ আগস্ট ভারী বৃষ্টি, ১৪ ও ১৫ আগস্ট ভারী বৃষ্টি এবং পরবর্তী দিনগুলিতেও ভারী বৃষ্টির সতর্কতা দেখানো হয়েছে। ([Mausam][4])

এর পিছনে মূল কারণ হল উত্তর বঙ্গোপসাগরের নিম্নচাপ। IMD-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী এই আবহাওয়া ব্যবস্থা পরবর্তী সময়ে আরও সংগঠিত হয়ে পশ্চিমবঙ্গ ও সংলগ্ন বাংলাদেশের উপকূলের দিকে উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হতে পারে। ([Mausam][1])

তাই আগামী কয়েকদিন কলকাতা সহ দক্ষিণবঙ্গের আবহাওয়ার দিকে নজর রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

নবীনতর পূর্বতন