F

বৃষ্টি কেন হয়? মেঘ থেকে বৃষ্টি নামার কারণ জানুন সহজ ভাষায়

বৃষ্টি কেন হয় এবং মেঘ থেকে কীভাবে বৃষ্টি নামে
আকাশে মেঘ জমার পর কীভাবে বৃষ্টি তৈরি হয়, জানুন সহজ ভাষায়।


বৃষ্টি কেন হয়? মেঘ থেকে বৃষ্টি নামার রহস্য

 ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে হঠাৎ দেখি আকাশ কালো মেঘে ছেয়ে গেছে, কিছুক্ষণ আগে রোদ  ছিল হঠাৎ করে কালো মেঘে চারিদিকে ছেয়ে যাওয়াটা এটা অদ্ভুত লাগে। তার কিছু পরেই শুরু হল টিপ টিপ  করে বৃষ্টি তারপরে ঝমঝম করে। বৃস্টি কমবেশি সকলের পরিচিত কিন্তু বৃষ্টি আসলে তৈরি হয় কিভাবে 

আকাশ মেঘে ছেয়ে  গেলেই বৃষ্টি হয়, বৃষ্টির আগে হঠাৎ এত ঘুট ঘুটে লাগে কেন? বৃস্টির  পরেও অনেক সময় গরম লাগে। আবার একই সময় কলকাতার এক জায়গায় বৃষ্টি কিন্তু  অন্য জায়গায় পূর্ণ  শুকনো রাস্তা এক ফোঁটাও বৃষ্টি নেই।


বৃষ্টি আসলে কোথা থেকে আসে 

সহজ করে  বললে বলতে হবে বৃষ্টির জল আসলে পৃথিবীর জল। নদীর, পুকুর, খাল,জলাশয় এবং সমুদ্রের জল সূর্যের তাপে ধীরে ধীরে বাস্প  হয়ে  বাতাসে মিশে যায়। শুধু জলাশয় নয়  মাটির জল এবং গাছপালার মাধ্যমে বাতাসে জলীয় বাস্প হয়ে  যোগ হয়। এই জলীয় বাস্প  আমরা দেখতে পাই না। বাতাসের সঙ্গে মিশে সেটি উপরের দিকে উঠতে থাকে। মেঘ  জল থেকে জলীয় বাষ্প জল চক্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। 


আকাশের মেঘ জমে কিভাবে  

মেঘকে আমরা আকাশে তুলোর মতো দেখতে পাই ভেসে বেড়ায়। মেঘ আসলে তুলো নয় এর মধ্যে থাকে অসংখ্য ক্ষুদ্র জলকণা এবং অসংখ্য বরফ কণাও কিছু কিছু ক্ষেত্রে। 

সূর্যের তাপে জল বাষ্প হয়ে উপরে উঠতে থাকে উপরে গিয়ে যখন এই আদ্র বাতাস ঠান্ডা হয় তখন জলীয় বাষ্প ঘূর্ণিভূত হয়ে ক্ষুদ্র জলকণায় পরিণত হয় এই জলকনাগুলো বাতাসে ভাসমান। খুব ছোট ছোট কণা কে কেন্দ্র করে জমতে পারে ধীরে ধীরে অনেক একত্রিত  এক জায়গায় জমে  মেঘ তৈরি করে। তাই আকাশে মেঘ দেখলেই মনে রাখা দরকার সেটি শুধু ধোঁয়ার মত কিছু নয় তার মধ্যে প্রচুর ক্ষুদ্র জলকোন  থাকতে পারে। 


মেঘ হলেই কেন সবসময় বৃষ্টি হয় না 

এই যে প্রশ্নটা কিন্তু অনেকের মনেই থাকে, এর আসল কারণ হলো আমরা অনেক সময় দেখি  আকাশ পুরো মেঘে ঢেকে গেছে কিন্তু ঘন্টার পর ঘন্টা চলে গেলেও এক ফোঁটাও বৃষ্টি নামে না এক্ষেত্রে যেটা হয় মেঘের মধ্যে থাকা জনকনা সব সময় বৃষ্টির ফোঁটার মতো বড় হয় না খুব ছোট জলকণা হলে সেগুলো বাতাসে ভেসে থাকতে পারে যখন মেঘের মধ্যে জলকোনা  একে অপরের সঙ্গে জুড়ে  বড় হতে থাকে এবং যথেষ্ট ভারী হয়ে যায় তখন সেগুলোর বাতাসে ভেসে থাকতে পারে না, মধ্যাকর্ষণের টানে নিচের দিকে নামতে শুরু করে আর তখনই আমরা তাকে বৃষ্টি রূপে দেখতে পাই। 


বৃষ্টির আগে আকাশ এত অন্ধকার লাগে কেন 

বৃষ্টি হওয়ার আগে অনেক সময় দেখা যায় আকাশ পুরো  কালো হয়ে গেছে অর্থাৎ কালো মেঘে ছেয়ে গেছে। এর সাধারণ এবং প্রধান কারণ হলো মেঘেদের ঘনত্ব পাতলা হলে মেঘের মধ্যে দিয়ে সূর্যের আলো কিছুটা দেখা যায় কিন্তু মেঘ যখন অনেক ঘন হয়ে যায় তখন সূর্যের আলো তার মধ্যে দিয়ে সহজে নিচে আসতে পারে না, তাই মেঘের নিচের অংশে অনেকটা কালো বা গারো ধূসর দেখায়। এই ধরনের ঘন মেঘের সঙ্গে বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকতে পারে তবে খুব কালো মেঘ দেখেই নিশ্চিত বলা যায় না যে খুব ভারী বৃষ্টি হবে। 


বৃষ্টির আগে আমাদের গুমোট লাগে কেন 

বৃষ্টি নামার আগে কলকাতার মতো শহরে অনেক সময়ে একটা অদ্ভুত গরম বা গুমোট অনুভূত হয়। এর বড় কারণ হলো বাতাসে জলীয় বাষ্প বা আদ্রতা বেড়ে যাওয়া। বাতাসের আদ্রতা বেশি থাকলে শরীরের ঘাম সহজে শুকায় না, ফলে  তাপমাত্রা খুব বেশি না হলেও আমাদের কাছে পরিবেশটা বেশি গরম অনুভূত হয়। 

এই কারণেই বৃষ্টির আগে অনেক সময় মনে হয় গরমটা যেন আরো বেড়ে গেল আবার বৃষ্টি শুরু হওয়ার পর বাতাসও পরিবেশের অবস্থা পরিবর্তন হলে কিছুটা স্বস্তি পাওয়া যায়। 

জলচক্রের চিত্রে বাষ্পীভবন, মেঘ তৈরি, বৃষ্টিপাত, নদী-খাল ও সমুদ্রে জল ফিরে যাওয়ার প্রক্রিয়া



বৃষ্টি  থামার পর আবার গরম লাগে কেন 

অনেকেরই অভিজ্ঞতা আছে, বৃষ্টি হলো কিছুক্ষণ ঠান্ডা লাগলো কিন্তু বৃষ্টি থামার কিছুক্ষণ পর আবার গরম শুরু হয়ে গেল। এর পেছনে আদ্রতার একটা বড় ভূমিকা থাকে। বৃষ্টি হওয়ার পর পরিবেশের জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেশি হতে থাকে তার সঙ্গে যদি রোদ  বেরিয়ে আসে তাহলে মাটি ও আশপাশের জল আবার বাস্প  হতে শুরু করে ফলে বৃষ্টি থামার পরেও বাতাস ভারী  হতে পারে এবং খুব গরম অনুভূত হয়।


একই সময় এক জায়গায় বৃষ্টি, অন্য জায়গায় শুকনো থাকে এমন পরিস্থিতি হয় কেন 

এটা কলকাতা আশপাশে এলাকায় প্রায়ই দেখা যায় এক জায়গায় প্রবল বৃষ্টি হচ্ছে কিন্তু কয়েক কিলোমিটার না সামান্য কিছু ক হাত দূরে বৃষ্টি নেই এর কারণ বৃষ্টি সবসময় সমান ভাবে ছড়িয়ে পড়ে না বিশেষ করে বজ্র মেঘ বা  স্থায়ীভাবে তৈরি হওয়া শক্তিশালী মেঘ খুব নির্দিষ্ট এলাকায় বৃষ্টি দিতে পারে, ফলে একটি এলাকার রাস্তা জলপূর্ণ হলেও অন্য  এলাকায় মানুষ বৃষ্টির দেখাই পেল না।


বজ্রপাতের সঙ্গে  বৃষ্টির সম্পর্ক কি

 বৃষ্টির সময় অনেকেই প্রথমে আকাশে বিদ্যুৎ চমকাতে দেখেন তারপর কিছুক্ষণ পর প্রচন্ড শব্দ শোনা যায়। বজ্রঝরে মেঘের মধ্যে শক্তিশালী প্রভাব এবং জলকানাও বরফকোনা  চলাচলের ফলে বৈদ্যুতিক পার্থক্য তৈরি হতে পারে সেই চার্যের বড় ধরনের নির্গমন থেকেই বজ্রপাত হয়। কিন্তু বজ্রের শব্দ পরে শুনি কারণ আলো শব্দের  তুলনায় অনেক দ্রুত চলে। সেই জন্যই আকাশের ঘন কালো মেঘ ঘনঘন বিদ্যুৎ চমকানো এবং জোরে বাতাস শুরু হলেই বিষয়টি হালকা হবে না নেওয়া উচিত। 


প্রশ্ন হলো বৃষ্টি কি শুধু উপকারই করে 

না, বৃষ্টি যেমন দরকারি অতিরিক্ত বৃষ্টি আমার সমস্যাও তৈরি করতে পারে। তাই পর্যাপ্ত বৃষ্টি কৃষির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। জমিতে জল পৌঁছায় পুকুর জলাশয় ভরে ওঠে এবং জলের  স্বাভাবিক চক্র বজায় থাকে। কিন্তু অল্প সময়ে খুব বেশি বৃষ্টি হলে শহরের নিকাশি ব্যবস্থা চাপে পড়ে যায় রাস্তা গলি এবং নিচু এলাকায় জল জমতে পারে, জনজীবনের একটা সমস্যা তৈরি হয়।

অতিরিক্ত বৃষ্টির ফলে নদীর জল বাড়তে পারে, কোথাও কোথাও বন্যার পরিস্থিতি ও তৈরি হতে পারে তাই বৃষ্টি ভালো না খারাপ এটা প্রশ্ন  না। কতটা বৃষ্টি হচ্ছে কোথায় হচ্ছে সেটাই আসল জানার বিষয়। 


বৃষ্টি কিসের জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ কেন 

আমাদের খাবারের সঙ্গে বৃষ্টির সম্পর্ক অনেক গভীরভাবে জড়িত ধান,পাট বিভিন্ন শাকসবজি এবং অন্যান্য অনেক ফসলের জন্য পর্যাপ্ত জলের দরকার হয়। অনেক এলাকায় কৃষকরা বর্ষার বৃষ্টির উপরই নির্ভর করে। বৃষ্টি না হলে মাটিতে আদ্রতা আসে না আবার অতিরিক্ত বৃষ্টি হলে জমিতে জল দাঁড়িয়ে ফসল নষ্ট থাকে, তাই কৃষির ক্ষেত্রে বৃষ্টি সময় মত এবং প্রয়োজনমতোই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।


বৃষ্টির জল কোথায় যায় 

বৃষ্টি হয়ে জল মাটিতে পড়ার পর সব জল এক জায়গায় থাকে না কিছু জল মাটির মধ্যে ঢুকে যায়। কিছু জল ছোট নালা খাল বা নদীর দিকে চলে যায় আবার কিছু জল পুকুর জলাশয়, কিছু  অন্য জায়গায় জমে থাকে শেষ পর্যন্ত এই জল বিভিন্ন পথ ধরে নদী ও সমুদ্রের দিকে ফিরে যায়। তারপর সূর্যের তাপে আবার আস্তে আস্তে জল বাষ্প হয়ে আকাশের দিকে ওঠে, এই ভাবেই পৃথিবীতে জল ঘুরে ঘুরে চলতে থাকে আর এই চলমান প্রক্রিয়াকেই আমরা জল চক্র বলে থাকি। 


বৃষ্টির সময় কি কি সাবধানতা নেওয়া উচিত 

বৃষ্টি হলে শুধু ছাতা নিলেই দায়িত্ব শেষ না। বজ্রপাতের সময় খোলা জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকা ঠিক নয়, বড় গাছের নিচে আশ্রয় নেওয়া নিরাপদ নয়, রাস্তায় জল জমে গেলে বৈদ্যুতিক খুঁটিবা তার বা বিদ্যুতের অন্য সরঞ্জামের কাছাকাছি যাওয়া উচিত নয়। বৃষ্টির মধ্যে বাইক বা গাড়ি চালালে গতি কমিয়ে চালানো উচিত কারণ ভেজা রাস্তায় ব্রেক করলে গাড়ি সঙ্গে সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ নাও হতে পারে। ভারী বৃষ্টি সতর্কতা থাকলে অপ্রয়োজনে বাইরে না বের হওয়াটাই যুক্তিযুক্ত। 


অবশেষে 

একটাই কথা বৃষ্টি আমাদের প্রতিদিনের জীবনের খুব সাধারন একটা ঘটনা হলেও এর পেছনে রয়েছে প্রকৃতির অসাধারণ একটা ব্যবস্থা। জল বাষ্প হয়ে আকাশে ওঠে সেই জলীয় বাষ্প ঠান্ডা হয়ে ছোট ছোট জলকণায় পরিণত হয়, জলকণাগুলো একসঙ্গে জমে মেঘ তৈরি করে, পরে জলকনা বড় ভারী হয়ে মধ্যাকর্ষণের টানে নিচে নেমে আসে তখনই আমরা বৃষ্টি দেখতে পাই। 

বৃষ্টি  কখনো স্বস্তি নিয়ে আসে, আবার  কখনো জলবদ্ধতার  কারণ হয়ে উঠতে পারে, তাই বৃষ্টি নিয়ে শুধু আনন্দ করার পাশাপাশি আমাদের  সতর্কতার দিকে নজর রাখা দরকার।

নবীনতর পূর্বতন